Pallab's Site
Md Ashfaqur Rahman Pallab
Home
AboutExpand About
Blog
ServicesExpand Services
Albums
Guestbook
Contact

নাসিকা গর্জন


clock October 5, 2009 11:40 by author Pallab

আমরা বাঙ্গালী জাতি নাকি যতো গর্জাই ততোটা বর্ষাই না। যদিও গর্জনেই যদি কাজ হাসিল হয়ে যায়, তাহলে বর্ষানোরই বা দরকার কি তা আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে তেমন একটা বোধগম্য হয় না। এ নিয়ে অবশ্য খুব একটা মাথা ঘামাতেও আমি রাজি না। গুণীজনেরা যা বলেন তা বিনা বাক্যব্যায়ে মেনে নিতে পারাতেই তো পরমানন্দ! তাই বলে বর্ষনকেও আমি মোটেই হেলাফেলা করতে রাজী না। বাংলার গ্রামে বর্ষার রূপ যে না দেখেছেন তাকে কোন রকম তর্জন গর্জনেই সেই রূপ বুঝানো সম্ভব না। এছাড়া নারীর অশ্রু বর্ষনের কথাই ধরুন। যে কোন পুরুষের গুরুগর্জনকে ছাপিয়ে প্রবল বন্যায় ভাসিয়ে দিতে তাদের কয়েক ফোঁটা অশ্রু বর্ষনই যথেষ্ট। ভাগ্যিস আমরা যতো গর্জাই ততোটা বর্ষাই না। নইলে যে পরিণতি কি হতো তা একমাত্র উপরওয়ালাই জানেন।

যাকগে, বর্ষন না, আজ স্রেফ গর্জনের উপর দিয়েই কাহিনী শেষ করতে চাচ্ছি। আর গর্জনের পটভূমি হচ্ছে আমার লন্ডনের প্রবাস জীবন।

ছাত্র জীবন নাকি পরম সুখের জীবন। তো সেই হিসাবে লন্ডনে ছাত্র হিসাবে বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছিলাম। পড়ালেখার নাম করে মন চাইলে মাঝে মধ্যে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পে পদচারণা, এবং এদিক সেদিক ছিটেফোঁটা পার্ট টাইম চাকরী। সেই চাকরীতে পড়ালেখার খরচ দূরে থাকুক, থাকা-খাওয়ার খরচ তুলতে তুলতেই জানের অবস্থা কাহিল। বাইরে সুধৈর্য ভিজে বিড়াল ভাব ধরে রাখলেও মনে তাই নিত্য আক্ষেপের তর্জন গর্জন। সেইসাথে নতুন কোন চাকরী অর্জনের চেষ্টায় দ্বারে দ্বারে অবিরত ধর্না। আর এই করতে করতেই একদিন খিটখিটে এক জার্মান বুড়োর দেখা পেয়ে গেলাম। অবসরপ্রাপ্ত মানুষ। কামকাজ তেমন নেই। সম্ভবতঃ কথা বলার কাউকে দরকার বলেই আমাকে ওয়েব ডেভেলপার হিসাবে নিয়োগ দিয়ে দিলেন। খুব একটা মনযোগী শ্রোতা না হলেও মুখে অমায়িক টাইপের হাসি ঝুলিয়ে কারো কথা শুনার ভান করাটা আবার অনেক আগেই মোটামুটি রপ্ত করা ছিলো। ফলে বুড়োর প্যানপ্যানানী এবং তর্জন গর্জন দু'টোই সাফল্যের সাথে সামাল দিয়ে চাকরীর নামে বুড়োর বাসায় আমার নিত্য যাতায়াতে তেমন সমস্যা হচ্ছিলো না। (বলতে ভুলে গেছি। বুড়োর অফিস নামক বস্তুটা তার বাসার লিভিং রুমেই অবস্থিত ছিলো।) এই চাকরী নিয়েও অনেক মজার কাহিনী আছে, তবে তা পরে কখনো হয়তো ব্লগাতে পারি।

এদিকে মোটামুটি সম্মানজনক এই চাকরীটা পেতে না পেতেই মাথায় বিনা গর্জনে বজ্রপাত হলো। এক বাঙ্গালী আংকেল-আন্টির বাসার দুই রুমে আমরা চার বাঙ্গালী ছাত্র আস্তানা গেড়েছিলাম। (আমার জীবনের বিশেষ কয়েকজন অতি শ্রদ্ধেয় আংকেল আন্টির মধ্যে ওঁনারা অন্যতম)। তো হঠাত করেই সেই বাসা ছাড়তে হলো। আমরা যেন দূরে সরে না যাই, আংকেল নিজে খুঁজে পেতে পাশের আরেক বাসায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমাদের চারজনের মধ্যে তিনজন সেই নতুন বাসায় অধীষ্ট হলাম। অপরজন এলাকার মায়া ত্যাগ করে নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা করলো। আগের বাসায় এক রুমে দু'জন করে থাকলেও এই নতুন বাসায় তিনজনের জন্যে একটাই মাত্র ইয়া বড় রুম। তাই রবিন নামক অতি বিনয়ী সুবোধ বালকও (!?!) এবার আমাদের সাথে একই রুমের সহম'রুমী'। মালপত্র বলতে প্রত্যেকেরই এক আধটা ইয়া বড় স্যুটকেস। তো নতুন বাসায় এসেই প্রথমে তিনজনের মধ্যে কিচিরমিচির শুরু হয়ে গেলো কে কোন বিছানা দখল করবো তা নিয়ে। তিনজনের মধ্যে আমি শুধু মুরুব্বীই না, বলা যায় বিশাল ব্যবধানে মুরুব্বী। তাই মুরুব্বীয়ানার বলে বলীয়ান হয়ে সবচেয়ে মনোরম অবস্থানের খাটে নিজের দাবী প্রতিষ্ঠিত করে সুখী সুখী চেহারায় তাতে আসন গেড়ে বসলাম। বাকী দু'জনও যে যার জায়গার দখল শেষে ধাতস্থ হলো।

সবকিছু গুছগাছ শেষে মনে অনাবিল প্রশান্তির সাথেই আমরা তিনজন ঘুমাতে গেলাম যে যার বিছানায়। একটা সময় ছিলো যখন নতুন জায়গায় গেলে মোটেই ঘুমাতে পারতাম না প্রথম কিছুদিন। তবে সেটা প্রাগৈতিহাসিক যুগের কথা। নিরলস অধ্যাবসায়ের ফল হিসাবে অনেকদিন যাবতই আমি শুধু যেখানে সেখানেই না, এমনকি বাস-ট্রেন-বিমান ভেদে যেকোন অবস্থাতেই নিদ্রাদেবীর আরাধণায় নিমগ্ন হয়ে যেতে পারি অনায়াসেই। (আবার দিনের পর দিন নির্ঘুম রাত পার করতে পারার ক্ষমতাটাও অধ্যাবসায়ের ফসল হিসাবেই অর্জন করেছি বলতে পারেন, কম্পিউটারের সামনে বসে চ্যাটিং করতে করতে)। তাই সেদিনও নতুন বাসায় ঘুমের ব্যঘাত ঘটার মতো কোন কারণ ছিলো না। প্রায় ঘুমিয়েও গেছিলাম বলা যায়। এমনই সময় হঠাত চমকে উঠলাম। এবং পরবর্তী সারাটা রাত যন্ত্রনা, বিরক্তি, ভীতি, অস্থিরতা, মাথার কিরিকিরি কাটকাট ভাব এবং আরও নানারকম জানা অজানা জটিল অনুভূতির মিশ্রপ্রতিক্রিয়ায় বিছানায় এপাশ ওপাশ করে কাটাতে বাধ্য হলাম।

স্বভাবতঃই পরদিন বুড়োর বাসায় যেতে যেতে অর্ধেক দিন খেয়ে ফেলেছি। তো যেই বুড়ো শুধুমাত্র আমাদের মতো কোমলমতি পরহিতৈষী যুবসম্প্রদায়ের জন্যেই খেয়ে না খেয়ে তার অমূল্য জীবনের বাকী দিনগুলো প্রতিদিন উত্‌সর্গ করে যাচ্ছেন, তিনিই বা এহেন অনাচার সহ্য করবেন কোন দুঃখে? আর দুঃখ সহ্য করতে না পেরে তিনি যদি রাগে-অভিমানে একটু তর্জন গর্জন এবং হালুম হুলুম করেই ফেলেন, তাতে আমার মতো বিনয়ী বিগলিত একজন অমায়িক মানুষের মাইন্ড করাও মোটেই শোভা পায় না। কি বলেন? আমিও তাই মাইন্ড করতে পারলাম না চেষ্টা করেও। বরং বুড়োর দুঃখে বিদগ্ধ হয়েই নিজের দুঃখের কথা বয়ান শুরু করলাম। বললাম, নতুন বাসা এবং বাসা চেঞ্জের হ্যাপা নাহয় তাও কোনমতে সামাল দেয়া যায়, কিন্তু সেইসাথে যদি সারা রাত কারও বেসুরো নাকের তর্জন গর্জন শুনে বিনিদ্র রজনী পার করতে হয়, তাহলে আমার মত নরাধমেরই বা আর কি করার আছে? তাও যদি সেই গর্জনের ন্যূনতম তাল-লয়-ছন্দ বোধ থাকতো তাহলেও হয়তো ছন্দের তালে তালে কোন এক সময় মনের ভুলে ঘুমিয়ে পড়তেও পারতাম। কিন্তু যদি "ঘর্‌র্‌র্‌র ফোস ফোস... ঘেঁয়াঊ... হুক... ক্রুউউ ফুস্‌স্‌স... হুক্‌ক ঘর্‌র্‌র..." এমনতরো বেতাল ব্যঞ্জনা চলতে থাকে, তাহলে আমি ক্যাবলাই বা কি করতে পারি?

"কি!?! নাসিকা গর্জন???" এতক্ষণে যেন বুড়ো আমার দুঃখটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারলেন। সম্ভবতঃ এ নিয়ে নিজের অতীতের কিছু কাহিনীও তার বিস্মৃত (কিংবা বিস্মিত) স্মৃতিতে দোলা দিয়ে গেলো। চিন্তাক্লিষ্টভাবে পায়চারী করতে করতে তিনি বললেন, "না না, এ যে বড় সর্বনেশে কথা হে বাপু! এভাবে তো একটানা চলতে পারে না। শিঘ্রই একটা ব্যবস্থা করতে হবে"। বলে তিনি আরও গম্ভীরভাবে পায়চারীতে নিমগ্ন হয়ে গেলেন।

সারাদিন মনের সুখে অফিসে বসে বসে চিকেন গ্রেভী প্রোগ্রামিং করলাম। অতংপর বীর বিক্রম যুদ্ধাংদেহী মনোভাব নিয়ে মনের সুখে গুনগুন করতে করতে বাসায় ফিরে আসা। চোখে জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল দৃষ্টি, মুখে "এবার দেখে নেবো" টাইপের মিটিমিটি হাসি। শত হলেও এখন খালি হাতে আর যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ন হতে হবে না। অতএব, "বিনা যুদ্ধে নাহি দেব বিনীদ্র রজনী" চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঘুমের প্রস্তুতি নিতে লাগলাম।

রাতের আড্ডা হৈচৈ শেষে যথা সময়ে যে যার বিছানায় অধীষ্ট হলাম। আমি বাকি দু'জনের দিকে মুচকি হাসি বর্ষন করতে করতে বিজয়ীর ভঙ্গিতে ব্যাগ থেকে বসের দেয়া প্যাকেটটা বের করলাম। অতংপর প্যাকেট থেকে কানে দেয়ার দু'টো ইয়ার প্লাক বের করে দুই কানে ঠেসে দু'জনের ফ্যালফ্যালে দৃষ্টির সামনে আয়েশী ভঙ্গিতে পাশ ফিরে চোখ বুজলাম। এবার যতো খুশী নাসিকা সঙ্গীত চর্চা করো সারা রাত। কুছ পরোয়া নেহি!


এই কাহিনীর পর বেশ অনেক দিন পার হয়ে গেছে। তদ্দিনে নাসিকা রন্ধ্রের বেতাল গর্জনের মধ্যেও আধুনিক স্টাইলের এক বিশেষ তাল-লয়-সুর আবিস্কার করে ফেলেছে আমার উর্বর মস্তিষ্ক। অতএব কানে তুলো না দিয়েই সেই আধুনিক ব্যঞ্জনার তালে তালে বেশ আয়েশে ঘুমানোয় অভ্যস্ত তখন আমি। বরং কোনদিন যথাসময়ে নাসিকা গর্জনে রুম মাতোয়ারা না হলেই যেন ঘুমের ব্যঘাত ঘটতো আমার।

তো সেই সময় বাংলাদেশ থেকে দু'জন মাঝবয়েসী মেহমান এসে হাজির হলেন আমাদের বাসায়। বাসার মালিক তাদের জন্য আগের থেকেই আলাদা এক রুম ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্তু মাঝরাতের দিকে একজন আমাদের রুমে এসে হাজির। বললেন আমরা যদি কিছু মনে না করি, তাহলে তিনি বাকী রাতটা আমাদের রুমের সোফায় ঘুমাতে চান। আমরা খুশী মনেই মেহমানকে সোফা ছেড়ে দিয়ে আবার নিদ্রাদেবীর আরাধনায় নিমগ্ন হয়ে গেলাম। তবে দেবী মনে হয় তখন আর ততোটা প্রসন্ন ছিলেন না। তাই একটু পরেই পিলে চমকানো ভঙ্গিতে আমার দেহ শুন্যে একটা লাফ দিয়ে বিছানায় ধপ্পাস করে পড়লো। অদ্ভুত অজানা এক আতঙ্ক নিয়ে ঘুম ভেঙ্গে বুঝার চেষ্টা করতে লাগলাম কি হচ্ছে রুমে। কিন্তু মস্তিষ্ক সচল হবার আগেই প্রকম্পমান ভয়াল গর্জনে আত্মারাম প্রায় খাঁচা ছাড়ি ছাড়ি করেও কোনমতে আবার দেহধামে ধাতস্থ হবার প্রয়াস পেলো। সুন্দরবনের বাঘের গর্জনকেও হার মানানো গর্জনে ততোক্ষণে আমাদের রুম বেশ মাতোয়ারা। ভয়াল সেই গর্জনের তালে তালে রুমের সব আসবাবপত্রও বেশ কেঁপে কেঁপে উঠছে। সেই সাথে থেকে থেকে কেঁপে উঠছে আমার প্রায় অবশ হয়ে আসা দেহখানি। খরখরে ঘরঘরে গর্জনে বারংবার শিরশিরে এক অনুভূতির ঢেউ খেলে যাচ্ছে ছেঁড়ে-দে-মা-কেঁদে-বাঁচি মনে। এবং এই আতঙ্ক নিয়েই এক সময় আবিস্কার করলাম যে নতুন জ্বালাময়ী বিপদটির উৎস আমাদের সোফায় ধরাশায়ী নধরকান্তি মেহমানপ্রতীমের উন্নত নাসিকাখানি।

আমার এতোদিনের অভিজ্ঞ নাসিকাগর্জন পরাস্তকারী কর্ণদ্বয়কেও হার মানাতে পারে, এমন নাসিকা গর্জনের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে করতে আমি আবেগে বেশ বিহবল হয়ে পড়লাম। বাঘের উপরেও তাহলে সত্যিই ঘোগ বলেও কিছু থাকে বটে! তবে শুধু আমিই না, কিছুক্ষনের মধ্যেই আবিস্কার করলাম যে ঘোগের গর্জনে স্বয়ং বাঘ পর্যন্ত পরাস্ত! পাশের বিছানা থেকে ফিসফিসে কাতর কন্ঠ আমাকে শুধালো, "পল্লব ভাই, আপনার কানে দেয়ার তুলো কি এখনও কিছু বাকি আছে?" আহারে, বেচারা! একই রকম কাতর কন্ঠে আমিও ফিসফিসিয়ে বললাম, "নেই। আপাতত আমার মতোই কানে দুই আঙ্গুল দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে দেখো।"

কবে কোন কবি যেন বলেছিলেন সুদীর্ঘ রজনীরও একসময় সমাপ্তি ঘটে। আমাদের বিনীদ্র রজনীরও তাই এক সময় সমাপ্তি হলো। ভোরের আলোর সাথে সাথে ঘোগের গর্জন বাঘের গর্জন হয়ে শেষে বেড়ালের মিউ মিউ হতে হতে এক সময় মিইয়ে গেলো। লাল লাল চোখ নিয়ে উসকু খুসকো চুল এবং দিশেহারা চেহারার আমরাও এক সময় হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। এতক্ষণের টর্চার সহ্য করে শরীরও এবার হাল ছেড়ে দিলো। অতএব আবারো বিছানায় ধপ্পাস্। আতঙ্কে নয়, এবার আরামে দু'চোখ বুঁজলাম।

বেশ বেলা করে বিছানা ছেড়ে কিচেনে গিয়ে হাজির হলাম পেটপূজা করতে। সেখানে আমাদের রাতের অতিথিও বিদ্যমান। ওঁনাকে রাতে আমাদের রুমে থাকতে দেয়ায় বারবার বিনয়ীভাবে ধন্যবাদ জানাতে লাগলেন। বললেন, "মাঝরাতে আপনাদের এভাবে ডেকে তুলার জন্য আমি খুবই দুঃখিত। কিন্তু কি করবো বলুন, আমার সঙ্গীটি এমন কঠিন নাক ডাকেন যে ঘুমাতে না পেরে বাধ্য হয়ে আপনাদের রুমে গিয়ে হাজির হয়েছি।"

আমি কিছুক্ষন হা করে মেহমানের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ঘোগের উপরেও তাহলে আরও কিছু থাকতে পারে! ভাগ্যিস ইনার বদলে দ্বিতীয় সেই মেহমানটি রাতে আমাদের রুমে এসে হাজির হননি!



Dushshopno


clock February 11, 2009 10:44 by author Pallab

দুঃস্বপ্ন


ঘোর কৃষ্ণ রাত। পরিবেশ একেবারে নিথর, নিশ্চুপ। গ্রাম্য মাটির এক অপ্রশস্ত রাস্তায় দাড়িয়ে আছি আমি, একা। চারদিক অন্ধকারে আচ্ছন্ন। রাস্তা থেকে এক শাখা রাস্তা চলে গেছে বাম দিকে। সেই রাস্তা ধরে থেমে থেমে এগিয়ে চলেছি আমি। মনে সন্দেহ, এবং অদ্ভুত এক অস্বস্তি। রাস্তাটা কিছুদূর গিয়েই সামনে শেষ হয়েছে। শেষ প্রান্তে অন্ধকারের পটভূমিতে আরও কাল রঙের ঝোপঝাড়ের আভাস টের পাওয়া যাচ্ছে। তার ওপাশে অনেক বড় একটা বিল আছে টের পেলাম। রাস্তার দু'পাশেও ছাড়া ছাড়া ঢোলকলমীর ঝোপ রাস্তার উপরে হেলে আছে। অনেকদিনের অব্যাবহৃত পথ। কিছুদূর এগিয়েই থেমে দাড়ালাম আমি। তিক্ষ্ণ দৃষ্টি পথের শেষ প্রান্তে। বুঝার চেষ্টা করছি সেখানে কি আছে যা আমাকে আকর্ষন করছে। মন চাচ্ছে না আরও এগিয়ে যাই, কিন্তু তারপরও অদ্ভূত ভীতিকর সেই আকর্ষনে আরও কয়েক পা সামনে গিয়ে থেমে দাড়ালাম। এবার রাস্তার শেষ মাথা অনেকটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। ঝোপ ঝাড়ের ফাঁক দিয়ে রাস্তা বরাবর সেখানে এবার বাঁশের তৈরী অতি পুরানো এক টয়লেট আবিস্কার করলাম, যা বাঁশের খুঁটির সাহায্যে বিলের উপর অবস্থিত। রাস্তাটা এই টয়লেটে যাবার জন্যেই ব্যবহৃত হতো। কিন্তু টয়লেট না, টয়লেটের বেড়ার দরজার বামদিকে ঝোপের অন্ধকারের মধ্যে আমার দৃষ্টি স্থির। আমি ছাড়াও আশেপাশে আমি অন্য কনো প্রাণের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি যা ধীরে ধীরে আমার চেতনার উপর প্রভাব বিস্তার করছে। সামনে কাল অন্ধকারে তার চেয়েও কাল অতি লম্বা এক মানুষের আকৃতি পরিস্কারভাবে ফুটে উঠছে এবার আমার দৃষ্টিতে। একেবারে স্থির হয়ে আছে তা, মূর্তির মতো। পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাল কাপড়ে ঢাকা। মুখের জায়গাও কাল অন্ধকার। বুঝতে পারলাম এই অস্তিত্বই আমাকে এখানে টেনে এনেছে। টের পাচ্ছি আমার মনের উপর অন্ধকার ও ভীতিকর এক জোরালো দখল। দৃষ্টি আরও তিক্ষ্ণ হলো। কালো ঘোমটার আরও ভিতরে দেখার চেষ্টায় ব্যস্ত। এবং ধীরে ধীরে সেখানে ফুটে উঠলো হলদেটে স্থির একজোড়া জ্বলন্ত চোখ। স্থির জীবন্ত দৃষ্টিতে তা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বিশাল ক্ষমতাধর ভীতিকর সেই অস্তিত্বের অনুভূতিতে প্রচন্ড আতঙ্ক গ্রাস করে নিলো আমাকে। সেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে কিছু করার তুলনায় অতি ক্ষুদ্র আমি, কালো অন্ধকারের জগতে আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে লাগলো তার আকর্ষনে।

প্রচন্ড আতঙ্ক নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম আমি শেষ রাতে। স্বভাবতঃই বাকী রাতটুকু আর ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি আমি একা সেই রুমে। এমনই জীবন্ত বাস্তব সেই আতঙ্ক যে তারপরও আরও বেশ কয়েকদিন আমি তা স্পষ্ট অনুভব করেছি। চোখ বন্ধ করলেই চখের সামনে ভেসে উঠেছে সেই অবয়ব, মৃত্যুর স্থিরতায় হলদেটে একজোড়া জীবন্ত চোখ। অনুভব করেছি অন্ধকার ভিন্ন এক জগতের আগ্রাসী আকর্ষন।

এখনও প্রায়ই অন্ধকার সেই জগতের অস্তিত্ব ও আকর্ষন টের পাই আমি। সেই সাথে স্বপ্নীল সুন্দর ভিন্ন কোন জগতের হাতছানিও যেন অনুভব করি কখনো কখনো, কিন্তু কল্পনায় স্পষ্ট ফুটিয়ে তুলতে পারি না তা কখনো। আমাদের বাস্তব জগত যেন এই দুই জগতের মিলনস্থল। আমাদের প্রতিটি কাজই যেন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এদের কোন না কোন একটার আকর্ষনে। হয় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি বন্দিত্বের সেই অন্ধকার জগতের দিকে, নয়তো স্বপ্নের এক মুক্ত জগতের দিকে। কিন্তু আমরা কি তা অনুভব করতে পেরেছি ঠিকমতো? নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছি আমাদের মনের এক এক বন্দীত্ব থেকে?



Dui Pagoler Prolap


clock May 27, 2008 05:51 by author Pallab
দুই পাগলের প্রলাপ

তিনি ছিলেন এক তালগাছের অধিকারিনী। সারাদিন সেই গাছের মাথায় বসে থাকতেন। এবং সেখান থেকে মাঝে মধ্যে এই অধমের উদ্দেশ্যে কিছু মহত্‌ বানী নিক্ষিপ্ত করতেন। আর এভাবেই অনলাইনে চলতো আমাদের দু'জনার বানী বিনিময়। তার কিছু আপনাদের উদ্দেশ্যে এখানে উত্‌সর্গ করলামঃ  

পাগল কইন্না

নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই
,
যে করিবে কুস্তি
তারে হইতে হইবে হস্তী

......

পাগল কবি

কে ওই শুনালো মোরে কুস্তির ধ্বনি...
চর্মে চর্মে সেই সুর
চুলকালো বহুদূর
,
ওষ্ঠাগত প্রাণ বুঝিলো এমনি
...
কুস্তি লড়ে যে হস্তী বাহিনী

সকালে উঠিয়া আমি প্রার্থনা করি
সারাদিন আমি যেন কুস্তি লড়ি

পিটাইতে বলেন যারে হস্তিনী মোরে
আমি যেন ঠিকমতো পিটাই তাহারে

......

পাগল কইন্না

চল চল চল
কুস্তির মাঠে হাতীর পাল
কুস্তি লইড়া দিমু ফাল
হাতে সবার গাছের ডাল
চলরে চলরে চল
...

......

পাগল কবি

যতোই তুমি লাফাও না কেন
কুস্তি লড়ায় ঝাপাও না কেন
মট্ করে আর যতোই ভাঙ্গো ঠ্যাং
,
তারচে বরং এখন থেকে
তোমার হবু জামাইটাকে
কথায় কথায় মারবে না আর ল্যাঙ

ওই বেচারা কেঁদেকেটে
অনেকটা দূর লেংচে হেটে
আমার কাছে নালিশ দিলো এসে
,
মনের মাঝে প্রেম যা ছিলো
সব নাকি তার বিফল গেলো
তোমার সাথে কুস্তি লড়ায় ফেঁসে

......

পাগল কইন্না

এমন ডাঁহা মিছা কথা
হবে তোমার মুখে ব্যাথা
আমার জামাই অনেক ভাল
করেনা সে মুখটা কালো

আমিও মোটেই মারিনা তারে
সে ভালা পায় আমারে

আমারে ভীষনই ভালবাসে
দেখলে আমায় শুধুই হাসে...

আর আমি বেশ নিরীহ মেয়ে
চোখ দিয়া দেখ চেয়ে
...

......

পাগল কবি

কাব্য ছড়া লিখতে হলে
ছন্দ সাজাও মিথ্যে বলে
এইতো নিয়ম কাব্য লেখার জানি
,
তাইতো তুমি নিজেও দেখি
কাব্য লেখায় হায়রে এ কি
!
জামাই নিয়ে করছো টানাটানি

আরে বাবা জামাই বাপু
যতোই না হোক বিশালবপু
স্ত্রী বলেন স্লিম যে তিনি ভারী
,
এমনি করে মিথ্যে বলে
কাব্য গেঁথে সুখের ছলে
স্ত্রী ঢাকেন মনের আহাজারী

কি আর করা তুমিও তবে
প্রশংসা তার চালাও সবে
দোষটা ঢেকে নিভৃত আড়ালে
,
জীবনটা এক জোয়ার ভাটা
তোমার হাতেও থাকবে ঝাঁটা
মিষ্টি কথার ভাবখানা ফুরালে

......

পাগল কইন্না

মিথ্যা নিয়া গবেষনা???
ফাগল অতো বেশী ভাইবো না
...
হাতে না থাকলে ঝাঁটা
জামাইয়ের পায়ে বিঁধবে কাঁটা

তুমি এতো চিন্তিত কেন্
?
আর ইউ ভীতু ম্যান
?
কাব্য আমি লিখতে পারি
পারিনা দিতে ঝাঁটার বাড়ি

আমার জামাই-র নাই তো ভুড়ি,
কারণ তার ঐ দৌড়াদৌড়ি

লম্বায় সে তালগাছ
পছন্দ করে খাইতে মাছ...

তোমার কি কি প্রিয় বলো
ইয়াহু-তে নাই, কি হলো
?

......

পাগল কবি

ইয়াহু-তে কেমনে বলো থাকি?
মেইল করি চেক অফিস দিয়ে ফাঁকি

পরলে ধরা খবর আছে জেনো
,
তাইতো আমি চ্যাটিংয়ে নাই কোন

মাঝে মধ্যে চান্সটা পেলে তাই
মেইলটা শুধু চেক করে যে যাই

তারই মাঝে একটু আরও বেশি
ফাঁকি দিয়ে ছন্দে লেখা কঁষি

কিন্তু তোমার ব্যাপারখানা দেখি
সারাক্ষনই অনলাইনে, সে কি
!
দিনরাত নাই চ্যাটিং করে চলো
ভাবি দেশের আজ এ কি হাল হলো
!
ছেলে মেয়ে আজ ইঁচড়ে পাঁকা
এই বয়সেই প্রেম করে দেয় ছেঁকা

ভাল হতে খরচ তো নাই কোন
থাকতে সময় শুধরাও এখনো

......

পাগল কইন্না

সকালেতে থাকলে পরে ক্লাশ
দৌড় দিতে হয় পানি খেয়ে এক গ্লাস

দুপুর বেলায় ফিরলে পরে বাসায়
নেট-এ আসার সুযোগ আমি পাই

এই হলো রুটিন নিত্যদিনের
তুমি কিনা দোষ দিলা চ্যাটিংয়ের
?
সারাক্ষনই অনলাইনে যদি থাকি
বাসায় আমায় আস্ত রাখবে নাকি?

আসি আমি সব কাজটাজ সেরে
হিংসা করছো বুঝলাম এইবারে...

আমি অনেক লক্ষী আর ভাল
মনটা আমার নয় মোটেই প্যাঁচালো

ফাঁকি তো সেই তুমি মারো দেখি
অফিস ফেলে অনলাইনে দাও উঁকি

বলছি শুনো সময় এখনো আছে
ভাল হও, সময় পালায় পাছে

......

পাগল কবি

তোমার ডেইলী রুটিন দেখে
পাচ্ছে আমার হাসি
,
এতোকিছুর মাঝেও চালাও
ভাল বাসাবাসি

আমি তো আর অফিস ছেড়ে
চ্যাটিংয়ে নাই কোন
,
মাঝে মাঝে মেইল করা চেক
ফাঁকি না কখনো

ঘরের থেকে অফিস ফাঁকি
এমন কি আর বড়
,
তুমি তো ঘর ফাঁকি দিয়ে
ইটিশ পিটিশ করো

তারচে বলি সময় আছে
বাদ দাও এই সবই
,
প্রেমের চেয়ে বাপ-মা বড়
বলেন পাগল কবি

......

পাগল কইন্না

পাগল কবি অফিস বসে
কাব্য লিখে যায়
,
তার উপদেশ শুনে আমার
ভীষন কবিতা পায়

ইটিশ পিটিশ করছি আমি
সবাইকে জানিয়ে
,
খারাপ যদি করতাম কিছু
মারতো পিটিয়ে

আমার ডেইলী রুটিনেতে
অনেক টানাটানি
,
বাসে করে অনেকটা পথ
অনেক হয়রানী

কই তুমি মুখ বাঁকাবে
আমার জন্যে আফসোসে
,
তুমি কিনা তা না করে
হাসছো বসে বসে

আমি এসে এখন নেট-
পেলাম কবির কাব্য
,
কিন্তু আমি এখন কি এই
মেইল পাওয়া নিয়ে ভাববো
?
পাগলটা যে হাসবে বসে
চ্যাটিং তাহার চলছে
,
দেশের হবে কি যে এবার
মনে মনে তাই বলছে

......

পাগল কবি

উপহাসে কাব্য যদি লেখো,
হাজার আরো উপদেশেই
ভাসবে তুমি দেখো

কাব্য লেখা বেশ তো তোমার আসে
,
ছন্দে ছড়ায় সাজাও কথা
তরল পরিহাসে

যাও চালিয়ে এমনি করে লেখা
,
তাই বলে ফের বাদ দিও না
তোমার পড়ালেখা

একসাথেই চলতে থাকুক সবই
,
ইটিশ পিটিশ সেটাও নাহয়
থাকলো তোমার হবি

একদিন ঠিক হবে তোমার জানি
-
পাগলী কবির খেতাব সহ
কতো না সম্মানী

......

পাগল কইন্যা

এই যে শুনেন
মাঝখানেতে ছিলাম না দুই ঘন্টা
বইয়ের মাঝে ছিলো যে এই মনটা

দু'দিন পরে শুরু হবে এক্সাম
,
এই ভেবে মাথায় চলছে বেশ জ্যাম

ফাঁকি দিলে করবো আমি ফেইল
,
আর খোঁটা দিয়ে আপনি লেখবেন মেইল

উপহাস না হাসতে আমি ভালবাসি,
কথায় কথায় পায় যে শুধুই হাসি

উপদেশ আর উপহাসের মাঝে হাসি দিয়ে
সব কিছু বেখেয়ালে যাই আমি এড়িয়ে

করছেন কি অফিস বসে
ধূমপান কি চলে
?
সহ্য হয় না ধোঁয়া আমার
নাকটা শুধুই জ্বলে

আজকে রাতের মেনুতে আছে
ডালের ভর্তা আর করলা ভাজি
মেনু শুনে আমায় আবার বলবেন না
মেয়েটা কি পাজি!!!

এবার তবে যাই
কাব্য পেয়ে কালকে দিবো আবার রিপ্লাই

......

পাগল কবি

কাব্য লেখায় দেরি হলো
একখানা দিন, সরি
,
তোমার লেখা পড়ে দিলাম
হেসেই গড়াগড়ি

এক্সামটা সামনে যদি
বন্ধ করো পড়া
,
তারচে বরং মনের সুখে
লিখতে পারো ছড়া

এই সময়ে পড়লে মাথা
জ্যাম হবে যে আরও
,
সারা বছর যা পড়েছো
তাই লিখো যা পারো

আমার সদাই প্রবলেম হয়
এক্সামেতে এসে
,
যখন আমি যা পড়েছি
মাথায় বেড়ায় ভেসে

কোনটা ছেড়ে কোনটা লেখি
পাইনা ভেবে কুল
,
এক্সাম ঠিক পাস হয়ে যাই
যতোই লেখি ভুল

ধোঁয়ার জালে আমারো পায়
ভীষন হাঁচি-কাশি
,
তাইতো আমি ধুমপানহীন
থাকি বার মাসই

ফুসফুসেতে ভরলে ধোঁয়া
লাভ কোন নেই তাতে
,
তাও দেখি ঠিক অনেক ছাগল
বেড়ায় বিড়ি হাতে

ভাবে এতেই পুরুষ পুরুষ
ভাবটা বাড়ে বেশি
,
ছাগলগুলোর কান্ড দেখে
মুচকি আমি হাসি

নিজের পায়ে কুড়াল মেরে
ভাবছে তারা সুখে
,
এমনি করেই চামে তারা
যাবে বিড়ি ফুঁকে

যাকগে বরং থাক সে কথা
বলে কি আর হবে
,
সময় আসুক তখন ঠেলা
বুঝবে ঠিকই সবে

মেনুর কথা বলে আমার
আনলে জিভে পানি
,
চাখতে আমার সখ হলো খুব
ডালের ভর্তাখানি

তার মাঝে দাও একটু যদি
সরষে তেলের ছোঁয়া
,
অল্পক্ষণেই দেখবে তোমার
ভর্তা সবই হাওয়া

বাসায় গিয়ে আজ আমারো
ভর্তা করার আশা
,
নিজের হাতে রান্না করাই
আমার যে ভরসা

......

পাগল কইন্না

ছড়া আমি না পেয়ে আজ
ভাবছিলাম কি হা হা
,
ছন্দ বুঝি পাননি খুঁজে
কি দুঃখ আহা
!
কথা বলার মাঝখানেতে
নেট হয়ে গেলো হাওয়া
,
কি আর করা বিরস মুখে
পিসি থেকে উঠে যাওয়া

এখন এসে পেলাম আপনার
বেশ কিছু অফলাইন
,
তারপরেতে পেলাম আবার
ছড়ার অনেক লাইন

ধুমপানের গন্ধ আমার
বড্ড খারাপ লাগে
,
কেন জানি মানুষের এই
ধোঁয়ার নেশা জাগে
!
আপনি যে নন তাদের দলে
খুশি হলাম বেশ
,
আসুন এবার আপনাকে দেই
ধন্যবাদ অশেষ

আমার পড়ার ধরনটা
বেশ আজীব রকম
,
টেবিলে বসে পড়তে আমার
ভাল লাগে কম

পড়ি আমি বিছানায় বসে
বই খাতা সব ছড়িয়ে
,
কখনো বসে কখনো শুয়ে
পড়ায় যাই হারিয়ে

খুব বেশি পড়ি না আমি
করিও না মুখস্ত
,
অল্প পড়েই যা লেখি
টিচার হয় সন্তুষ্ট

যাকগে এবার ভর্তার কথায় আসি,
ভর্তা খেতে আমি খুবই ভালবাসি

আলু ডাল বেগুন কিংবা
মিষ্টি কুমড়ার সাথে
-
পেঁয়াজ মরিচ সরষের তেল
খেতে লাগে জোস ভাতে

আপনার কষ্টে আমি
খুবই হলাম সমব্যাথী
,
করার নেই কিছুই আর
দেয়া ছাড়া সিমপ্যাথী

আমি যাবো একটু পরে
লাইট অফ করে শুনবো গান
,
ভাল থাকবেন ফাগল কবি
যেইভাবে থাকতে চান

......

পাগল কবি

তোমার লেখা পেয়ে মনে
জাগলো খুশির রেশ
,
মানতেই হয় ছড়া লেখায়
দক্ষ তুমি বেশ

আমি যেমন পাগল কবি
পাগলি তুমিও তবে
,
ছড়া লেখায় উন্নতি যে
তোমার হবেই হবে

ছড়া লেখার পাগলামিটা
পাগলামি নয় মোটে
,
এই ধরনের পাগল যেন
সবখানেতেই জোটে

তাইতো তোমার পাগলামিটা
নিত্য যেন বাড়ে
,
এই কামনাই করছি আমি
আজকে বারে বারে

 

বিশেষ নোটঃ পাগল কইন্না হচ্ছেন আমার সেই নেট ফ্রেন্ড, যার সাথে ইমেইলে কবিতায় কবিতায় লেখালেখি চলতো। আর ইন্টারনেটে যে আমি নিজেই পাগল কবি হিসাবে পরিচিত সেকথা তো বলাই বাহুল্য। Cool 



Biddyut Bisleshon


clock October 30, 2007 07:01 by author Pallab

বিদ্যুত বিশ্লেষণ

তখন আমি ক্লাস ফোর কি ফাইভে অধ্যায়নরত বিশিষ্ট বিজ্ঞানীমনোভাবাপন্ন এক ব্যক্তিত্ব। যদিও আমার গবেষনার বেশিরভাগই ছিলো জলীয় উপাদান। গবেষনার স্বার্থেই তাই দিনের বেশিরভাগ সময় পুকুর-নালায় ডুবাডুবি এবং মাছ ধরা নিয়া ব্যস্ত সময় কাটাইতে হইত। মৎস্যকূলের মনঃস্তাত্ত্বিক বিন্যাস হইতে লইয়া তাহাদের কোন প্রজাতিকে কিভাবে খালি হাতে, বরশি দিয়া কিংবা গামছা প্রয়োগে পাকড়াও করিতে হইবে, এই সকল বহুবিধ বিষয়েই আমার গবেষনার ক্ষেত্র বিস্তৃত ছিল। তবে আমার এই জলজ গবেষনা এবং এলাকার অন্যান্য আদমসন্তানদের আমার গবেষনামূলক প্রতিভার প্রতি সম্মান, কোনকিছুরই তোয়াক্কা না করিয়া আমার মহান মাতৃদেবী মাঝে মধ্যেই প্রকাশ্য দিবালোকে জনাসম্মুখে পুকুর হইতে তুলিয়া আমাকে কানে ধরিয়া হিড়হিড় করিয়া টানিয়া বাসায় ফেরত লইয়া যাইতেন।

সেই সময় মুন্সীগঞ্জ শহরে গ্যাসীয় ব্যবস্থাপনা তেমন একটা ছিল না বিধায় প্রায় সকলের বাসাতেই কেরোসিনের স্টোভ কিংবা ইলেক্ট্রিক হিটার ব্যবহারে রন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করিতে হইত। আমাদের বাসাতেও তাই সিলিন্ডার গ্যাসের পাশাপাশি স্টোভ এবং ইলেক্ট্রিক হিটার, দুইখানাই বহাল তবিয়তে বিদ্যমান ছিল। আমার গবেষনার বড় একটা অংশ তৎকালীন সময়ে রান্নাঘরেও কাটিত বটে। স্টোভ এবং হিটার হইতে লইয়া তরকারীর কাঁটাকাটি উচ্ছিষ্ট, কোন কিছুই আমাকে কম আকৃষ্ট করিত না।

কথায় আছে "ভর দুক্কুর বেলা, ভূতে মারে ঢেলা"। তো সেইদিন নিঝুম দুপুরে আমার মাথাতেও যেন ভূতের ঢেলাই পড়িল একখানা। বেশি কিছুদিন যাবতই হিটার লইয়া একখানা চিন্তা মাথায় ঘুরিতেছিল। হিটারে তো বিদ্যুত রূপান্তরিত হইয়া তাপে পরিণত হয়। যেই তাপে কিনা রান্নাবান্না সমাধা হইয়া থাকে। কিন্তু তাপে রূপান্তরিত হইবার পরেও কি সেইখানে বিদ্যুত বলিয়া কিছু অবশিষ্ট থাকে? মানে হিটারে হাত দিলে তো হাত পুড়িবেই, জানা কথা। কিন্তু সেইসাথে ইলেক্ট্রিক শকও খাইব কিনা উহাই ছিল আমার গবেষনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। এবং তাহা প্রমানের পদ্ধতিও একখানাই জানিতাম, যাহাকে বলে হাতেকলমে পরীক্ষণ। কয়দিন ধরিয়াই তাই ভাবিতেছিলাম যে হিটারে হাত দিয়া তাহা পরীক্ষা করিয়া লইব কিনা। কিন্তু কোনমতেই সাহসে কুলাইতেছিল না। তো সেইদিন ঠিক করিলাম যাহা হয় হইবে, কিন্তু আজ আমি দেখিয়াই ছাড়িব কি হয়। যেই ভাবা সেই কাজ। মনে মনে নিজেকে বোকা বলিয়া গালমন্দ করিতে করিতেই রান্নাঘরে গিয়া হাজির হইলাম। "আরে বেকুব, তুই জানিসই যে আগুনে হাত দিলে হাত পুড়িবেই, তাহার পরেও উল্লুকের মত হাত দিতে চাইতেছিস?! তোর কি আর এই জীবনে আক্কেল বলিয়া কোন পদার্থ মস্তিষ্কে গজাইবে না?" নিজেকে এহেন গালমন্দ করিতে করিতেই হিটারের সুইচ অন করিলাম। এবং হিটারের লোহিত বর্ণের কয়েল দেখিতে দেখিতেই সম্মোহিত হইয়া একসময় যা হয় হইবে ভাবিয়া কয়েলে হাত দিয়া বসিলাম। ব্যস, এর পরে আমার যতটুকু স্বরণে আসে আমার পুরা দেহ উড়িয়া গিয়া পিছনের দেয়ালে প্রচন্ডভাবে ধাক্কা খাইল। এবং ঐখানেই বেশ কয়েক মিনিট আমি অবশ হইয়া পড়িয়া থাকিলাম। এক সময় ধীরে ধীরে হুশ ফিরিল। বুঝিলাম যে এহেন মারাত্মক শক আমি পূর্বে আর কখনও খাই নাই। হাত তুলিয়া দেখি যে আঙ্গুলেরও কিছুটা অংশ ভালমতই পুড়িয়া গিয়াছে। পুরা মাথাই ফাঁকা ফাঁকা লাগিতেছিল, কিন্তু বুকটা ভারী ভারী বোধ হইতেছিল। এমন একখানা কান্ড ঘটাইয়া বসিলাম, ইহা এখন কাউকে না বলিতে পারিলে যেন বুকের ভার হালকা হইবে না।

অতএব বিক্ষিপ্ত পদচারণায় বেডরুমে গিয়া হাজির হইলাম। এবং ঠেলিয়া গুঁতাইয়া আমার মাতৃদেবীর নিদ্রাভঙ্গের প্রয়াস পাইতে লাগিলাম। অবাধ্য নাবালক সন্তানকে এহেন অভদ্রের ন্যায় দুপুরের সুখনিদ্রা ভঙ্গের কারন হিসাবে আবিস্কার করিয়া মাতৃদেবী নাতিশয় বিরক্তির সহিত চক্ষু তুলিয়া তাকাইলেন, এবং জানিতে চাহিলেন এই অশোভন কান্ডের হেতু কি। আমিও হড়বড় করিয়া আমার সুমহান কৃতকর্মের বৃত্তান্তকরতঃ ফলাফলস্বরূপ আমার পোড়া হাত প্রদর্শন করিলাম। "বোকা ছেলে কোথাকার! যাও, গিয়া ওষুধ লাগাও হাতে" বলিয়া মাতৃদেবী চরম বিরক্তির সহিত মাথা নাড়াইয়া অন্যদিকে কাত হইয়া আবার নিদ্রাদেবীর আরাধনায় নিমগ্ন হইলেন। আর আমি পাশের রুমে গিয়া দুই গালে হাত রাখিয়া খাটের উপর উপবিষ্ট হইয়া ফ্যালফ্যালে দুই চোখ শূন্যে নিবিষ্ট করিয়া জগত এবং জীবন লইয়া নানাবিধ আধ্যাতিক ভাবনা ভাবিতে লাগিলাম।



Gorugombhir Itikotha


clock October 25, 2007 13:28 by author Pallab

Gorugombhir Itikotha

গরুগম্ভীর ইতিকথা

"ভাই, এবার আপনি গরু, নাকি ছাগল?" প্রতি বছরই কোরবানীর সময় এলে এই ধরনের রসালো কথাবার্তা আমাদের প্রত্যেককেই কমবেশি শুনতে হয়। শুধু কোরবানীই না, আমাদের জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও গরুর ভূমিকা অপরিসীম। গৃহপালিত কোন একটি প্রাণীর নাম বলতে গেলেই সবার আগে শিং বাগানো লেজ দুলানো মনোরম যেই প্রাণীটির কথা আমাদের মনে দোলা দিয়ে যায়, তা নিঃসন্দেহে এই গরু বেচারাই বটে। গরু দিয়ে হালচাষ তো বটেই, গরুর মাংস-চামড়া থেকে নিয়ে গোবর পর্যন্ত আমরা কতোই না কাজে লাগাই।

আর এ জন্যেই সেই ছোটবেলা থেকেই কেন জানি গরুর সাথে আমার একটা বেশ আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। আমাকে দেখলেই গরুরা বেশ উদ্বেলিত হয়ে উঠতো, এবং নিজস্ব পদ্ধতিতে শিং বাগিয়ে ভাবের আদান-প্রদান করতে চাইতো। আশেপাশে গরু দেখলেই তাই আমার পঞ্চ ইন্দ্রিয় পুরো সজাগ হয়ে যেতো, এবং বিগলিত গরুর হাতে বিড়ম্বিত হওয়া থেকে বরং মানে মানে এলাকা থেকে কেটে পড়ার পায়তারা কষাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে বিবেচনা করতাম।

ঘটনা বরং শুরু থেকেই একটু খোলাসা করি।

আমার বয়স তখন পাঁচের আশেপাশে। সবেমাত্র আবিস্কার করেছি যে ম্যাচের বক্সে এঁটেল মাটি ভরে সাইজ করে রোদে শুকিয়ে আগুনে পোড়ালে ছোট ছোট বেশ সুন্দর ইট তৈরী হয়। অতএব আমরা তিন ভাই এবং আরও কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধুসহ পুরোদমে শুরু করে দিলাম আমাদের ইটভাটা প্রকল্প। যদিও আমার ছোট ভাইটা তখন অতিমাত্রায় ছোট ছিলো এসব মহান পরিকল্পনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহনের জন্যে, তবে আমাদের আশেপাশে থেকে বিভিন্নভাবে নর্তনকূর্দনের মাধ্যমে কাজে উৎসাহ দেয়ার প্রচেষ্টায় তার আন্তরিকতার কোন ঘাটতি ছিলো না। এবং এভাবেই মহা উদ্দমে চলতে লাগলো আমাদের ইট উৎপাদন। শুধু ইট তৈরী করেই ক্ষান্ত দিলাম না, সেই ইটের সাথে কাদামাটির সিমেন্টের প্রলেপে তৈরী হলো প্রায় কোমর সমান উঁচু দূর্গসদৃশ এক বিল্ডিং। সেই দূর্গে ছিলো নানারকম অত্যাধুনিক কারুকাজ। ছাদের উপরের এক খুপরী দিয়ে বালু ঢেলে দিলে তা আরও কয়েক খুপরী পার হয়ে ঝর্ণার মতো দূর্গের নিচর অংশ দিয়ে বের হয়ে আসতো। ছিলো আমাদের প্রত্যেকের মূল্যবান ধনরত্ন সংরক্ষণের জন্যে আলাদা আলাদা গোপন কুঠুরী। হিরে-পান্নার চেয়েও দামী আমাদের মার্বেলগুলোকে দূর্গের একেক ফোঁকরের মধ্যে ছেড়ে দিলে সেগুলো বিভিন্ন সুরঙ্গ অতিক্রম শেষে যার যার কুঠুরীতে গিয়ে জমা হতো। সেই কুঠুরীগুলোও আবার এমনই সুরক্ষিত যে এর থেকে ধনরত্ন বের করার জন্য অন্য আর কোনরকম ফাঁকফোকরই ছিলো না। একবার এর মাঝে মার্বেল ফেলা হয়েছে তো চোর দূরে থাক, মার্বেলের মালিকেরও সাধ্য ছিলো না দূর্গ আস্ত রেখে সেখান থেকে মার্বেলগুলো বের করে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু তাতে কি? গুপ্তধন নিরাপদে আছে এটাই তো সবচেয়ে বড় আনন্দের ব্যপার তার মালিকের কাছে।

এই দূর্গের পুরো নীলনকশাই ছিলো আমার বড় ভাইয়ের উর্বর মস্তিষ্ক নিঃসরিত, এবং তৈরীতেও মূল ভূমিকা ছিলো সেই সুমহান নায়কেরই। এবং অনেক অনেক দিন পরে একসময় আমরা এটাও আবিস্কারে সক্ষম হয়েছিলাম যে আমাদের প্রত্যেকের গোপন কুঠুরী থেকেই আরও গোপনে মার্বেল বের করে নেয়ার গোপন ব্যবস্থাও সে আমাদের অজান্তে এর মধ্যে করে রেখেছিলো।

যাই হোক, আমরা আমাদের গরু প্রসঙ্গ থেকে গড়াগড়ি করে ইতিমধ্যেই অনেকটা দূরে সরে এসেছি। এ যেন অনেকটা গরুর রচনা লিখতে গিয়ে গরু কোথায় ঘাস খায় সেই মাঠেরই গুনগান গাইতে থাকা। অতএব চলুন আমরা আবার লাইনে ফিরে আসি।

আমাদের ইটভাটায় ইট তৈরীর জন্যে কাঁচামাল হচ্ছে আঠালো এঁটেল মাটি। তাও আবার যেই সেই জায়গার মাটি হলেই হবে না। অনেক চড়াই উতরাই পার হয়ে বিচক্ষণ বড় ভাইয়ের নির্দেশ করা এক বিশেষ দূর্গম এলাকা থেকে সেই মাটি আনতে হতো। বাসার পিছনে রাস্তা দিয়ে কিছুদূর গেলে মাঠ, তার ওপাশে নিচু ধানক্ষেত, সেখানে জমে থাকা বোটঁকা গন্ধময় পানির মাঝখানে আইল দিয়ে সাবধানে ওপারে গেলে তবেই আমাদের মাটি কাটার জায়গা। তার ওপাশে বিশাল ফাঁকা মাঠ, আমার টেরিটরির বাইরের এলাকা।

তো সেদিনও আমি ডালিম নামের এক চালাক মস্তিষ্ককে সহকারী হিসাবে সাথে নিয়ে গেলাম মাটি সংগ্রহে। প্রখর রৌদ্রজ্জল ভরদুপুরের নিশ্চুপ শান্ত পরিবেশ। গাছের পাখিগুলোও পর্যন্ত খরতাপে বিরক্ত হয়ে ঝিমাচ্ছে। আশেপাশে কোথাও কেউ নেই। না, ভুল বললাম। বেশ কিছুটা দূরে ছোট ছোট শিংওয়ালা তাগড়াই কাল একটা ষাড় বেশ ভদ্রভাবেই ঘাস খেয়ে যাচ্ছিলো। অতএব এমন শান্তিময় পরিবেশে আমরা বেশ মনের সুখেই মাটি সংগ্রহে মগ্ন হয়ে গেলাম। এবং একসময় মাটির দায়িত্ব ডালিমের হাতে দিয়ে আমি আরেকটু সামনে মাঠের ঘাসফুলের উপর ঘুরে বেড়ানো ছোট ছোট রঙ্গীন প্রজাপতিগুলো ধরার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে গেলাম। মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।

কিন্তু এমন সময় বেরসিকের মতো পিছন থেকে ডালিম ফাউ কান্না শুরু করে দিলো। পিছে তাকিয়ে দেখি সে মাঠের ঢালে গড়াগড়ি করে কান্নাকাটি করছে আর বলছে যে কে নাকি তাকে মারে। কান্নার জন্যে কথা তেমন একটা স্পষ্ট নয়। অবাক কান্ড! আশেপাশে তো মারার মতো কেউই নেই, শুধু ২০-৩০ হাত দূরের ঐ গরুটা ছাড়া! আর আমরা নাহয় মহৎ একটা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য একটু মাটি চুরি করলামই, সেইজন্যে আমাদের মারতে হবে? নির্ঘাত সবই এই ছেলের নেকামী। ক'দিন আগেও এমন হয়েছে। মাঠে খেলতে খেলতে হঠাৎ কান্না। কি হয়েছে? না, তার পায়ের নিচে নিরীহ একটা মৌমাছি কিভাবে যেন পড়ে গিয়েছিলো। তো নিরীহ হলে কি তার বাঁচার অধিকার নেই? সেই অধিকার রক্ষার্থেই সে মরার আগে ছোট্ট একটা হুল ফুটিয়েছিল তার পায়ে। এ নিয়ে যে এত্তো কান্নার কি আছে সেটাই আমি বুঝি না! আরে, মৌমাছি ধরতে গিয়ে সেই বয়সেই আমি নিজেও কি কম হুল খেয়েছি নাকি? এমনও তো হয়েছে যে মৌমাছি কামড় দেয়, নাকি হুল ফুটায় সেটা বুঝার জন্যে মৌমাছি মেরে তার হুল নিয়ে নিজেই নিজের হাতে ফুটিয়ে দেখেছি হাত ফুলে কিনা। এমনও ধারনা ছিলো যে একবার হুল ফুটালে সেই হুলে আর বিষ থাকে না, ফলে পরবর্তীতে একি হুল আবারো ফুটালে কোন কিছুই হয় না। যদিও বাস্তবে পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেছি যে একই হুল যতো বার হাতে ফুটাই ততোবারই হাত ফুলে যায়, ব্যথা করে।

যাক, আমি তাই ডালিমকে একটা ধমক দিয়ে কান্না থামিয়ে মাটি তুলতে বলে আবার নিজের কাজে মগ্ন হলাম। কিন্তু এই নাচ্ছাড় ছেলে যেন কিছুতেই আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না বলে ঠিক করেছে। একটু আগেই ধমক খেয়ে উঠে দাড়িয়েছিলো, এবার ফিরে তাকিয়ে দেখি আমার কাছেই এসে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। চোখমুখ প্রচন্ড লাল হয়ে আছে, আর কোনমতে বলার চেষ্টা করছে যে গরু নাকি তাকে গুতায়। অবাক হয়ে গরুর দিকে তাকালাম! সে তো আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরে উল্টোদিকে দৌড়ে যাচ্ছে। কি দীপ্ত কি তেজীই না তার সেই দৌড়ের ভঙ্গি! কিন্তু আমার মুগ্ধ চোখের সামনেই একসময় গরু থেমে ঘুরে দাড়ালো। তারপর মাথা নিচু করে খুর দিয়ে কিছুক্ষন মাটি ঠুকে চার্জ করে ছুটে এলো আমাদের দিকে। এবং হঠাতই যেন দিব্যজ্ঞানের মতো টের পেলাম যে গরু দূরে থাকলেও কিভাবে ডালিম তার গুতা খেয়ে মাটিতে গড়াগড়ি যায়। এবার প্রচন্ড আতংকে ডালিমকে দৌড়াতে বলে আমি নিজেও উল্টোদিকে ছুট লাগালাম। এবং দৌড়াতে দৌড়াতেই পিছনে তাকিয়ে দেখলাম কিভাবে গরুর গুতায় ডালিম মাটিতে ডিগবাজি খেলো। প্রতিবার চার্জ শেষে গরু উল্টোদিকে কিছুদূর দৌড়ে নতুন প্রস্ততি নিয়ে আবার ফিরে আসে, আর প্রতিবার গরু উল্টোদিকে ঘুরলেই আমি দৌড়ে গিয়ে ডালিমকে তুলে আবারও ছুট লাগাই। এবং এভাবেই একসময় এহেন মূর্তিমান আতঙ্ক থেকে কিভাবে যেন নিরাপদ দুরত্বে চলে আসতে পারলাম। কিন্তু নিজেকে আবিস্কার করলাম আমার চেনাজানা টেরিটরির বাইরে পুরো অপরিচিত এক এলাকায়। তারপরে কিছুক্ষণ ডালিমের ব্যথার কান্না, আর কিছুক্ষণ "আমরা আর কখনো বাসায় ফিরতে পারবো না"-র কান্না সামলে কিভাবে পথ চিনে বাসায় ফিরলাম, সেটাও অনেকটা যেন স্বপ্নেরই মতো ছিলো।

অতএব এর পরে যদি কখনও আশেপাশে আমি গরু দেখি, এবং তার মুখে নিরাপদ বন্ধুসুলভ সদ্ভাবাপন্ন হাসি দেখেও ছিটকে দূরে পালানোর চিন্তা করি, তাহলে আমাকে নিশ্চয় আপনারা কেউ দোষ দিতে পারবেন না। বলতে কি, পরবর্তী বেশ কয়েক বছর আমার সেভাবেই কাটলো। ততোদিনে জায়গা পরিবর্তন হয়েছে, আমিও বেশ অনেকটা বড় এবং দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছি। এবং একসময় এটাও বুঝতে শিখেছি যে গরু মাত্রেই গোয়ার না, যদিও সবজায়গাতেই কিছু গোয়ারগোবিন্দ মর্কট থাকেই। এদের বাদ দিলে বাকী বেশিরভাগ গরুই নিরীহ গোবেচারা প্রাণী। তবে কাছে ঘেষতে দেয়ার আগে তাদের চোখ ও মুখের হাসি হাসি ভাব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বুঝে নিতে হয় যে এই বিশেষ অস্তিত্ত্বটি ঠিক কোন গোত্রে পড়ে।

বেশ অনেকদিন পরের কথা। আমি তখন ক্লাস টু কি থ্রি-তে পড়ি। বাসার কাছেই এক মুদির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে লজেন্স বা তেমন কিছু একটা কেনার পায়তারা করছি। এমন সময় তাকিয়ে দেখি রাস্তা দিয়ে একপাল গরু বেশ নাদুসনুদুসভাবে হেলেদুলে এদিকেই আসছে। এদের দলপতিটি যেমন লম্বাচওড়া, তেমনই চোখা লম্বা লম্বা শিং। বেশ রাজকীয় ভাব তার, হাটার ভঙ্গিতে পর্যন্ত যেন তার ব্যক্তিত্ব এবং মর্যাদা উপচে পড়ছে। তাই সচেতনভাবে পর্যবেক্ষন শেষে তার ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়েই যেন সিদ্ধান্ত নিলাম যে এই গরু কোনমতেই দায়িত্বজ্ঞানহীন উগ্র কেউ হতে পারে না। তাই একে ভয় পাওয়ারও কিছু নেই। বরং সে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার মর্যাদাকে সম্মান দেখানোর জন্যেই আমি আমার সবচেয়ে সুন্দর বিনয়ী হাসিটা তাকে উপহার দিলাম। কিন্তু হাসি বন্ধ হবার আগেই ঠক করে কি যেন একটা এসে আমার দাঁতে বাড়ি লাগলো। এবং ব্যপারটা কি হলো টের পেতে পেতেই দেখি যে গরুরাজ আমার মাথার সামনে থেকে তার শিং সরিয়ে যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব করে গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে আবার আগের মতোই গদাইলস্করী চালে হাটতে লাগলো নিজ গন্তব্যে। এ যেন গরুজাতির প্রতি আমার সম্মানকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যই করা হলো। তবে এর দুঃখটা ঠিকমতো অনুভব করতে পারার আগেই আশেপাশের সব লোক এসে আমাকে ঘিরে দাড়ালো। অনেকটা তাদের আগ্রহেই ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করতে গিয়ে দেখি যে গুতা খেয়ে আমার সামনের একটা দাঁত বেশ ভালভাবেই নড়ে গেছে। ভাগ্যিস তখন আমার বয়সটাই ছিলো দাঁত পড়ার বয়স। কিছুদিনের মধ্যেই তাই শুধু ঐ দাঁতই না, অন্য আরও অনেক দাঁতই পড়ে আবার নতুন করে গজিয়েছিলো।

তো এই হলো অবস্থা। আমি বুঝতে পারলাম যে আমার হিসাব দিয়ে গরুজাতি তাদের নিজেদের হিসাব করে না। করলে অবশ্য তাদের সম্মানই বৃদ্ধি পেতো। কিন্তু তারা যেন মানবপ্রদত্ত সম্মানকে তুচ্ছজ্ঞান করবে বলেই প্রতিজ্ঞা করে রেখেছে। কি আর করা, আমিও তাই যাবতীয় হিসাব নির্বিশেষে গরুজাতির সকলের কাছ থেকেই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলা শুরু করলাম।

আরও বছরখানেক পরের কথা। স্কুল শেষে বাজার থেকে হালকা কিছু বাজার করে একদিন আমরা দুই ভাই বাসার উদ্দেশ্যে হাটছি। আমার বড় ভাই অবশ্য এমন অনাকাংক্ষিতভাবে হাটতে বাধ্য হওয়ায় আমার উপরে মহা বিরক্ত। বাজারের টাকা বাঁচিয়ে তার সাথে রিকশাভাড়া যোগ করে আমি কেন অনর্থক ছোট একটা তাল কিনতে গেলাম, সেটাই তার রাগের মূল কারণ। অতএব বড় ভাই হিসাবে বাজারের ব্যগ তাকেই হাতে বহন করতে হলেও তালটা কোনমতেই তার হাতে গছাতে পারলাম না। ইতিমধ্যে বাসার প্রায় কাছাকাছি পৌছে গেছি। এমন সময় হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি এক রাখাল এক গরু নিয়ে এদিকেই হেটে আসছে। ব্যস, আর যায় কোথায়! ডানে বামে না দেখেই ভাইয়ের নিষেধ অমান্য করে আমি জোর হাটা দিলাম রাস্তা ক্রস করে উলটাপাশে যাওয়ার জন্যে। ভাগ্যিস ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে তখন এখনকার মতো এতো গাড়িঘোড়ার ভীড় ছিলো না। তারপরেও কিছু বুঝার আগেই টের পেলাম পায়ে যেন কিসের সাথে প্রচন্ড বাড়ি খেলাম, এবং পর মূহুর্তেই শুন্যে দশহাত উপরে ডিগবাজী খেয়ে পাশের এক সাইডরোডে ধপ্পাস করে আছড়ে পড়লাম। অবশ শরীরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম যে হাত থেকে তালটা ছিটকে রাস্তার পাশ দিয়ে গড়িয়ে নিচে নর্দমার দিকে নেমে যাচ্ছে। এতো সখের একটা তাল, সেটা এভাবে নর্দমায় পড়ে যাচ্ছে, এই দুঃখটাই বুকের ভিতর বাজতে লাগলো প্রচন্ডভাবে। কিন্তু না, গড়াতে গড়াতে মাঝপথেই তালটা থেমে গেলো। ইতিমধ্যে আমাকে আঘাত করা হোন্ডাটাও থেমে দাঁড়িয়েছে। আমি হাত-পা ঝেড়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে গিয়ে কোনমতে তালটা নিয়ে রাস্তায় ফিরে আসলাম। হোন্ডার আরোহী তো প্রচন্ডভাবে আমাকে এক বকা দিলো, যে এই বয়সেই এভাবে আমি মরতে চাই নাকি। কিন্তু তার কথার কি জবাব দেবো? আরোহীর পিছনে প্রায় আমার সমান বয়েসী ফ্রকপড়া এক মেয়ে বসে চোখ বড় বড় করে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। একটা মেয়ের সামনে আমার এমন লজ্জাস্কর একটা ঘটনা ঘটলো, অনেকটা সেই লজ্জাতেই যেন আমি নির্বাক হয়ে রইলাম। আমার বড় ভাইও নির্বাক হয়ে আমার দিয়ে তাকিয়ে আছে। আর হা করে আমার পা দেখছে। যাই হোক বাসায় ফেরার পথে ভাইকে বললাম যে বাসায় যেন এই ঘটনা কাউকে না বলে ও। তখনও টের পাইনি আশেপাশের সব লোকই কেন আমার পায়ের দিকে এমন হা করে তাকাচ্ছে।

বাসায় ঢুকেই সোজা দৌড় দিলাম বাথরুমের দিকে। যতো জলদি শরীরের ময়লয়া ধুয়ে সাফ করে ভদ্রবেশ ধারণ করা যায়, ততোই নিরাপদ আমি। কিন্তু তার আগেই আম্মার চিৎকার শুরু হয়ে গেলো যে মেঝেতে এত্তো রক্ত কেন, কার কি হয়েছে। এবং আমি ধরা পরে গেলাম। তখন পর্যন্ত অবশ্য সুস্থই ছিলাম বলা যায়। আম্মা কি দেখে এত্ত প্রলাপ-বিলাপ শুরু করেছে তা বুঝার জন্যে আমার পায়ের দিকে ভালমতো তাকিয়েই শেষে চরম ধাক্কাটা খেলাম। এক পায়ের হাটুর মাঝে বড় একটা গর্ত হয়ে আছে, আরেক পায়ের গোছার অনেকটা জুরে কোন চামড়া-মাংস নেই!

অতঃপর আমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে দৌড়াদৌড়ি, এবং স্কুল ফেলে পরবর্তী বেশ কয়েক সপ্তাহ আরামেই ঘরে শুয়ে বসে কাটিয়ে দেয়া। এজন্যেই মনে হয় বলে যে প্রত্যেক খারাপ ঘটনারও কিছু ভাল দিক থাকে। কারন এভাবে স্কুল ফাঁকি দিতে পেরে সেই মূহুর্তে এক্সিডেন্টের প্রতি আমি বরং বেশ কিছুটা কৃতজ্ঞই ছিলাম বলা যায়। আর কিছুটা কৃতজ্ঞতা বোধ হয় গরু জাতির প্রতিও এসে গিয়েছিলো।